মোকাদ্দমা বাতিল ও এবেটমেন্ট: কারণ, আইনগত ভিত্তি ও রহিতকরণ (বাংলাদেশের দেওয়ানী আইন)
লেখক: নাজমুল আলম অপু
এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
ভূমিকা
দেওয়ানী মামলার মূল লক্ষ্য হলো বিরোধের ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তি। তবে সব মামলা চূড়ান্ত ডিক্রি পর্যন্ত গড়ায় না। অনেক ক্ষেত্রে আইনগত বা প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে মোকাদ্দমা বাতিল (Dismissal) হয়ে যায় কিংবা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মামলা এবেট (Abatement) হয়ে পড়ে। আবার কিছু ক্ষেত্রে বাতিল বা এবেট হওয়া মোকাদ্দমা আইনসম্মত যুক্তি দেখিয়ে পুনরুজ্জীবিত বা রহিত (Set aside) করাও সম্ভব।
এই ব্লগে বাংলাদেশের দেওয়ানী কার্যবিধি, ১৯০৮ (CPC) অনুযায়ী—কখন ও কীভাবে মোকাদ্দমা বাতিল বা এবেট হয়ে যায় এবং কীভাবে তা রহিত করা যায়—সে বিষয়ে সহজ ভাষায় কিন্তু আইনগতভাবে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. মোকাদ্দমা বাতিল বলতে কী বোঝায়
মোকাদ্দমা বাতিল বলতে আদালতের এমন আদেশকে বোঝায়, যার মাধ্যমে মামলাটি মেরিটে না গিয়ে প্রক্রিয়াগত বা আইনগত কারণে খারিজ হয়ে যায়। এটি সাধারণত বাদীর ত্রুটি, অবহেলা বা আইন অমান্যের ফলাফল।
কখন মোকাদ্দমা বাতিল হতে পারে
বাংলাদেশের সিপিসি অনুযায়ী সাধারণত নিম্নোক্ত কারণে মোকাদ্দমা বাতিল হয়—
(ক) বাদীর অনুপস্থিতিতে মামলা বাতিল
- Order IX Rule 8 CPC অনুযায়ী, নির্ধারিত দিনে বাদী হাজির না হলে এবং বিবাদী হাজির থাকলে আদালত মামলা বাতিল করতে পারেন।
(খ) বাদীপক্ষ ত্রুটিপূর্ণ হলে
- Order VII Rule 11 CPC অনুসারে বাদীপক্ষ বাতিল হতে পারে, যদি—
- মামলা করার কারণ প্রকাশ না পায়
- যথাযথ কোর্ট ফি প্রদান না করা হয়
- মামলা আইনত নিষিদ্ধ হয় (barred by law)
(গ) মামলা পরিচালনায় ব্যর্থতা
- দীর্ঘদিন মামলা পরিচালনায় অনীহা বা অবহেলার কারণে আদালত মামলা বাতিল করতে পারেন।
আমরা আরও বলতে পারি যে,
মোকাদ্দমা বাতিল (Dismissal of Suit) বলতে আদালতের এমন একটি আদেশকে বোঝায়, যার মাধ্যমে কোনো দেওয়ানী মামলা তার মূল merit বা বিচারিক সত্যতা নির্ধারণে প্রবেশ না করেই সমাপ্ত বা খারিজ হয়ে যায়। অর্থাৎ, আদালত মামলার দাবির সত্য-মিথ্যা বিচার না করে প্রক্রিয়াগত, আইনগত বা বাদীপক্ষের ত্রুটির কারণে মামলা নিষ্পত্তি করে দেন।
মোকাদ্দমা বাতিল মূলত একটি প্রক্রিয়াগত পরিণতি, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়। এর উদ্দেশ্য হলো আদালতের সময় অপচয় রোধ করা, মামলার শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বিচার প্রক্রিয়ায় পক্ষগণের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
আইনগতভাবে মোকাদ্দমা বাতিলকে সাধারণত দুইভাবে দেখা হয়—
১) Dismissal for Default (ডিফল্টজনিত বাতিল)
২) Dismissal on Technical or Legal Grounds (আইনগত বা কারিগরি কারণে বাতিল)
২. মোকাদ্দমা এবেট (Abatement) হওয়া বলতে কী বোঝায়
এবেটমেন্ট হলো এমন একটি আইনগত অবস্থা, যেখানে কোনো পক্ষের মৃত্যু বা আইনগত অক্ষমতার কারণে মামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থগিত বা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
কখন মামলা এবেট হয়
(ক) পক্ষের মৃত্যুজনিত কারণে
- Order XXII CPC অনুযায়ী, কোনো পক্ষ মারা গেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইনগত উত্তরাধিকারী (Legal Representative) অন্তর্ভুক্ত না করলে মামলা এবেট হয়ে যায়।
(খ) পক্ষের দেউলিয়া বা অযোগ্যতা
- কোনো পক্ষ আইনগতভাবে অক্ষম হলে বা দেউলিয়া ঘোষিত হলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মামলা এবেট হতে পারে।
৩. বাতিল ও এবেট হওয়া মামলার মধ্যে পার্থক্য
| বিষয় | মামলা বাতিল | মামলা এবেট |
|---|---|---|
| কারণ | বাদীর অবহেলা/ত্রুটি | পক্ষের মৃত্যু বা অক্ষমতা |
| প্রকৃতি | আদালতের আদেশ | আইনের প্রভাবে |
| পুনরুজ্জীবন | নির্দিষ্ট শর্তে সম্ভব | নির্দিষ্ট শর্তে সম্ভব |
৪. মোকাদ্দমা বাতিল রহিত (Set aside) করা যায় কি?
হ্যাঁ, আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মোকাদ্দমা বাতিল রহিত করা যায়।
(ক) বাদীর অনুপস্থিতিতে বাতিল মামলা
- Order IX Rule 9 CPC অনুযায়ী, যথোচিত কারণ (Sufficient cause) দেখাতে পারলে আদালত বাতিল আদেশ রহিত করে মামলা পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন।
(খ) একতরফা ডিক্রি বাতিল
- Order IX Rule 13 CPC অনুযায়ী, যথাযথ কারণ দেখাতে পারলে একতরফা ডিক্রি বাতিল করা যায়।
৫. এবেটমেন্ট রহিত করা যায় কি?
হ্যাঁ, এবেট হওয়া মামলা রহিত করা যায়।
- Order XXII Rule 9 CPC অনুযায়ী, যথাযথ কারণ দেখাতে পারলে আদালত এবেটমেন্ট রহিত করতে পারেন এবং আইনগত উত্তরাধিকারী অন্তর্ভুক্ত করার অনুমতি দিতে পারেন।
৬. বাতিল বা এবেট রহিত করার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য যুক্তিসমূহ
বাংলাদেশের আদালতে সাধারণত নিম্নোক্ত যুক্তিসমূহ গ্রহণযোগ্য—
- পক্ষের অজ্ঞতা বা অনিচ্ছাকৃত বিলম্ব
- আইনজীবীর অসাবধানতা, যদি তা ইচ্ছাকৃত না হয়
- গুরুতর অসুস্থতা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ
- ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলার পুনরুজ্জীবন প্রয়োজন
আদালত সর্বদা ন্যায়বিচারের স্বার্থকে প্রাধান্য দেন।
৭. বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বারবার উল্লেখ করেছেন যে—
- প্রক্রিয়াগত আইন ন্যায়বিচারের সহায়ক, প্রতিবন্ধক নয়
- ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলে প্রযুক্তিগত ত্রুটি উপেক্ষা করা যেতে পারে
উপসংহার
মোকাদ্দমা বাতিল বা এবেট হওয়া দেওয়ানী বিচার ব্যবস্থার একটি বাস্তব অংশ। তবে আইন এসব অবস্থাকে চূড়ান্ত বলে গণ্য করে না। যথাযথ যুক্তি, সময়োপযোগী আবেদন এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালতের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারলে বাতিল বা এবেট হওয়া মোকাদ্দমা পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। সঠিক আইনগত জ্ঞান ও সচেতনতার মাধ্যমে পক্ষগণ তাদের ন্যায্য অধিকার রক্ষা করতে পারেন।