মামলার পক্ষ ও কারণ সংযোজন ও অপসংযোজন | CPC Order I & II Explained | Advocate Nazmul Alam Opu
বাংলাদেশের দেওয়ানি কার্যবিধি (CPC) অনুযায়ী মামলার পক্ষ ও কারণ সংযোজন, অপসংযোজন, আপত্তির সময়, মামলা খারিজ হয় কি না—উদাহরণসহ বিস্তারিত আইনি বিশ্লেষণ। লেখক: এডভোকেট নাজমুল আলম অপু, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

সঠিক পক্ষ সংযোজনের উদাহরণ (Proper Joinder of Parties)
দেওয়ানি মামলায় পক্ষ সংযোজন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মামলার প্রকৃত বিরোধ যাদের মধ্যে বিদ্যমান, কেবল তাদেরকেই পক্ষভুক্ত করা হলে মামলার বিচার কার্যক্রম দ্রুত, কার্যকর ও ন্যায়সঙ্গত হয়। বাংলাদেশের দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ (Code of Civil Procedure) এর Order I Rule 1 ও Rule 3 সঠিক পক্ষ সংযোজনের নীতিমালা নির্ধারণ করেছে।
Order I Rule 1 অনুযায়ী, একাধিক ব্যক্তি যৌথভাবে বাদী হতে পারেন যদি তাদের দাবি একই কার্য বা একই লেনদেন থেকে উদ্ভূত হয় এবং মামলায় অভিন্ন আইনগত বা বাস্তব প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। অপরদিকে, Order I Rule 3 অনুযায়ী একই শর্ত পূরণ সাপেক্ষে একাধিক ব্যক্তিকে বিবাদী করা যায়।
বাস্তব উদাহরণ
ধরা যাক, ক, খ এবং গ তিন ভাই যৌথভাবে একটি সম্পত্তির মালিক। পরবর্তীতে ঘ নামক ব্যক্তি উক্ত সম্পত্তির একটি অংশ অবৈধভাবে দখল করে নেয়। এই অবস্থায় ক, খ ও গ যৌথভাবে ঘ-এর বিরুদ্ধে দখল পুনরুদ্ধার ও স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে একটি দেওয়ানি মামলা দায়ের করতে পারেন।
এই মামলায়—
-
তিন ভাইয়ের অধিকার একই সম্পত্তি থেকে উদ্ভূত,
-
বিবাদীর কার্যকলাপ এক ও অভিন্ন,
-
মামলায় উত্থাপিত প্রশ্নসমূহও একরূপ।
অতএব, এখানে ক, খ ও গ যৌথভাবে বাদী হওয়া সম্পূর্ণ আইনসম্মত এবং এটি proper joinder of parties এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
আরেকটি উদাহরণ
একটি চুক্তির মাধ্যমে ক একটি ঠিকাদারি কাজ গ্রহণ করে, যেখানে খ ও গ যৌথভাবে কাজের মালিক। চুক্তিভঙ্গের কারণে ক নির্ধারিত টাকা পায়নি। এক্ষেত্রে ক একই মামলায় খ ও গ—উভয়কে বিবাদী করতে পারবে, কারণ উভয়ের দায় একই চুক্তি থেকে সৃষ্টি হয়েছে।
আইনি গুরুত্ব
সঠিক পক্ষ সংযোজনের মাধ্যমে—
-
একাধিক মামলা দায়েরের প্রয়োজন পড়ে না,
-
আদালতের সময় ও ব্যয় সাশ্রয় হয়,
-
পরস্পরবিরোধী রায়ের সম্ভাবনা হ্রাস পায়।
বাংলাদেশের উচ্চ আদালত একাধিক রায়ে মত দিয়েছেন যে, যাদের (মামলার পক্ষ) উপস্থিতি ছাড়া কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ রায় দেওয়া সম্ভব নয়, তাদেরকেই পক্ষ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। আবার যাদের সঙ্গে বিরোধের সরাসরি সম্পর্ক নেই, তাদের পক্ষভুক্ত করা অনুচিত।
সঠিক পক্ষ সংযোজন হলো ন্যায়বিচারের একটি অপরিহার্য উপাদান। একজন সচেতন আইনজীবীর উচিত মামলার শুরুতেই নির্ণয় করা—কে প্রয়োজনীয় পক্ষ এবং কে নয়। যথাযথভাবে পক্ষ সংযোজন করা হলে মামলার বিচার সহজ, দ্রুত ও ফলপ্রসূ হয়।
২. পক্ষ অপসংযোজনের উদাহরণ (Misjoinder of Parties)
উদাহরণ:
একটি ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ মামলায় বাড়ির মালিকের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়কে বিবাদী করা হলো, যার বাড়িটির উপর কোনো মালিকানা বা দখল নেই।
আইনি ফলাফল:
এই আত্মীয় মামলার জন্য অপ্রয়োজনীয় মামলার পক্ষ।
এটি misjoinder of party।
আদালতের করণীয়:
Order I Rule 10 CPC অনুযায়ী আদালত উক্ত অপ্রয়োজনীয় বিবাদীকে বাদ দিতে পারে।
৩. প্রয়োজনীয় পক্ষ বাদ পড়ার উদাহরণ (Non-joinder of Necessary Party)
উদাহরণ:
একটি বণ্টন (Partition) মামলায় তিন ভাইয়ের সম্পত্তি নিয়ে মামলা দায়ের করা হলো, কিন্তু একজন ভাইকে বিবাদী করা হলো না।
আইনি ব্যাখ্যা:
এখানে বাদ পড়া ভাই একজন necessary party, কারণ তার অধিকার নির্ধারণ ছাড়া পূর্ণাঙ্গ রায় দেওয়া সম্ভব নয়।
ফলাফল:
-
মামলা খারিজ না হলেও
-
আদালত সংশোধনের নির্দেশ দিতে পারে
-
সংশোধন না করলে মামলা ব্যর্থ হতে পারে
৪. একাধিক কারণ সংযোজনের বৈধ উদাহরণ (Proper Joinder of Causes of Action)
উদাহরণ:
বাদী একই বিবাদীর বিরুদ্ধে—
-
চুক্তিভঙ্গের ক্ষতিপূরণ
-
বকেয়া টাকা আদায়
একই মামলায় দাবি করলেন।
আইনি ভিত্তি:
Order II Rule 3 CPC অনুযায়ী এটি বৈধ, কারণ—
-
বিবাদী একই
-
আদালতের এখতিয়ার বজায় আছে
৫. কারণ অপসংযোজনের উদাহরণ (Misjoinder of Causes of Action)
উদাহরণ:
বাদী এক মামলায়—
-
জমি দখল পুনরুদ্ধার
-
তালাকের দেনমোহর
-
মানহানির ক্ষতিপূরণ
একসাথে দাবি করলেন।
আইনি বিশ্লেষণ:
এই দাবিগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির এবং ভিন্ন cause of action।
এটি misjoinder of causes of action।
ফলাফল:
আদালত মামলাটি বিভক্ত করতে বা সংশোধনের নির্দেশ দিতে পারে।
৬. অপসংযোজনের আপত্তি তোলার সময়ের উদাহরণ
উদাহরণ:
বিবাদী লিখিত জবাবে কোনো আপত্তি না তুলে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ার পর বলে—
“মামলায় পক্ষ অপসংযোজন আছে।”
আইনি ফলাফল:
Order I Rule 13 CPC অনুযায়ী এই আপত্তি বিলম্বিত হওয়ায় আদালত তা গ্রহণ নাও করতে পারে।
৭. অপসংযোজন থাকা সত্ত্বেও মামলা খারিজ না হওয়ার উদাহরণ
উদাহরণ:
একটি অর্থ আদায় মামলায় অপ্রয়োজনীয় একজন বিবাদী সংযোজিত হয়েছে।
আইনি নীতি:
Order I Rule 9 CPC অনুযায়ী—
শুধু misjoinder বা non-joinder এর কারণে মামলা খারিজ হবে না।
আদালতের করণীয়:
ভুল পক্ষ বাদ দিয়ে মামলাটি চলমান রাখা হবে।
৮. plaint সংশোধনের বাস্তব উদাহরণ
উদাহরণ:
বাদী ভুলক্রমে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে তার ম্যানেজারকে বিবাদী করেছে।
সমাধান:
বাদী Order VI Rule 17 CPC অনুযায়ী plaint সংশোধনের আবেদন করে সঠিক প্রতিষ্ঠানকে বিবাদী করতে পারে।
উপসংহারমূলক মন্তব্য
এই উদাহরণগুলো থেকে স্পষ্ট যে—
-
পক্ষ ও কারণ সংযোজন একটি কারিগরি বিষয় হলেও এর বাস্তব প্রভাব গভীর
-
আদালত সাধারণত ন্যায়বিচারকে প্রাধান্য দেয়
-
তবে আইনজীবীর অসতর্কতায় মামলা অপ্রয়োজনীয় জটিলতায় পড়তে পারে
✍️ লেখক:
এডভোকেট নাজমুল আলম অপু
এডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
মোবাইলঃ ০১৭১৫৯৯০৭৪১,০১৬৮০১৯১৯৯১।